
কক্সবাংলা ডটকম(৫ ডিসেম্বর) :: ২১ নভেম্বর ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছে বাংলাদেশ। ভূমিকম্পের ফলে পুরান ঢাকায় ভবনের রেলিং ধসে তিনজন ও নারায়ণগঞ্জে দেয়াল ধসে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে সবার মনে। এর আগে ২০২৩ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি তুরষ্ক-সিরিয়ায় আঘাত হানা শক্তিশালী ভূমিকম্প আতঙ্ক ছড়ায় বিশ্ববাসীর মনে।
৭.৮ মাত্রার ভূমিকম্প ও তার কয়েকটি আফটারশক (মূল ভূমিকম্পের পর পুনরায় ভূকম্পন)-এর কারণে নিহতের সংখ্যা ৪০ হাজার ছাড়িয়ে যায়। ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয় লাখ-লাখ মানুষ। ভূমিকম্পের এই ভয়াবহ চিত্র দেখে অনেক ভূমিকম্পপ্রবণ দেশই আবার চিন্তিত হয়ে উঠেছে নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে স্বল্প ও মাঝারি মাত্রার বেশ কিছু ভূমিকম্প হয়েছে। তবে এগুলোর কোনোটিতেই দৃশ্যমান ক্ষয়ক্ষতি ঘটেনি। ভূমিকম্পের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অবস্থান হওয়ায় বিশেষজ্ঞরা বারবারই সতর্কবার্তা দিচ্ছেন দুর্যোগের পূর্বপ্রস্তুতি গ্রহণ করতে। নিকট অতীতে বাংলাদেশে কোনো ভয়াবহ ভূমকম্পনের স্মৃতি না থাকলেও দেশের কয়েকশো বছরের ইতিহাসে রয়েছে বেশ কিছু বিধ্বংসী ভূমিকম্পের তালিকা। বিভিন্ন নথি ঘেঁটে পাওয়া বিগত শতকগুলোর সেসব ভূমিকম্পের সময়কাল ও বর্ণনা তুলে ধরা হলো দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের পাঠকদের জন্য।
বাংলাদেশের ভূখণ্ডে প্রথম বড় ধরনের ভূমিকম্প আঘাত হানে ১৫৪৮ সালে। এর ফলে বর্তমানে চট্টগ্রাম ও সিলেটের অবস্থান যেখানে, এই অঞ্চলে নানা জায়গায় মাটি ফেটে দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায়। সেখান থেকে দুর্গন্ধযুক্ত কাদা-পানি বেরোনোর তথ্যও পাওয়া যায়। তবে এই ভূমিকম্পে বর্ণনায় হতাহতের কোনো তথ্য লিপিবদ্ধ হয়নি।
পরবর্তী শতকে ১৬৪২ সালে এক শক্তিশালী ভূমিকম্পে সিলেট জেলার অনেক দালান-কোঠা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে সেবারও মানুষের প্রাণহানীর খবর পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশের ইতিহাসে লিপিবদ্ধ হওয়া অন্যতম বড় ভূমিকম্পটি ঘটে ১৭৬২ সালের এপ্রিল মাসে। ১৯০৮ সালের ‘ইস্টার্ন বেঙ্গল ডিস্ট্রিক্ট গ্যাজেটিয়ার চিটাগাং’-এর তথ্য অনুযায়ী, ১৭৬২ সালের ভূমিকম্পে চট্টগ্রাম জেলার অনেক জায়গায় মাটি ফেটে প্রচুর পরিমাণে কাদা-পানি ছিটকে বেরোয়। ‘পর্দাবন’ নামক জায়গায় একটি বড় নদী শুকিয়ে পড়ার বর্ণনাও পাওয়া যায় তখন। ‘বাকর চনক’ নামের এক অঞ্চলের প্রায় ২০০ মানুষ তাদের গৃহপালিত প্রাণীসহ পুরোপুরি নিমজ্জিত হয় সমুদ্রগর্ভে। ভূমিকম্পের পরবর্তী সময়ে ভূখণ্ডের বিভিন্ন জায়গায় সৃষ্টি হয় অতল গহ্বরের। মাটির নিচে কয়েক হাত গভীরতায় দেবে গিয়ে কিছু কিছু গ্রাম ভেসে যায় পানিতে।
কথিত আছে সীতাকুণ্ডের পাহাড়ে দুটি আগ্নেয়গিরি উৎপন্ন হয়েছিল সেই ভূমিকম্পের প্রভাবে। যদিও পরবর্তীতে আর চিহ্নিত করা যায়নি নির্দিষ্ট নামে বর্ণিত সেই স্থানগুলোকে। চট্টগ্রামের বর্তমান বাহারছড়া নামক জায়গাটিকে আঠারো শতকের সেই সময়ে ‘বাকর চনক’ নামে অভিহিত করা হয়েছে বলে অনুমান করা হয়।
১৭৬২ সালের এই ভূমিকম্পে চট্টগ্রামের পাশাপাশি ঢাকাতেও ভয়াবহ ভূকম্পনের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে ১৯১২ সালের ‘ইস্টার্ন বেঙ্গল ডিস্ট্রিক্ট গ্যাজেটিয়ার ঢাকা’তে। জেমস টেইলরের ‘আ স্কেচ অব দ্য টপোগ্রাফি অ্যান্ড স্ট্যাটিস্টিকস অব ঢাকা’র বর্ণনা অনুযায়ী, ঢাকার বিভিন্ন নদী আর ঝিলের পানিতে প্রবল আলোড়ন দেখা গেছে সেই ভূমিকম্পের সময়ে। পানির স্তরও সাধারণ সময়ের চেয়ে বেশি উঁচু হয়ে গিয়েছিল। ভূকম্পন শান্ত হলে পানি নিচে নেমে যাওয়ার পর অসংখ্য মরা মাছ ছড়িয়ে ছিল জলাশয়ের পাড়ে।
ভূপৃষ্ঠের প্রবল আলোড়নের পাশাপাশি এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল ভূগর্ভস্থ শব্দ। অসংখ্য বাড়িঘর ভেঙে পড়েছিল ভূমিকম্পের ফলে। প্রাণ হারিয়েছিল প্রায় ৫০০ মানুষ।
‘ইস্টার্ন বেঙ্গল ডিস্ট্রিক্ট গ্যাজেটিয়ার ঢাকা’র একই সংখ্যায় পাওয়া যায় ১৭৭৫ ও ১৮১২ সালের শক্তিশালী ভূমিকম্পের বর্ণনা। ১৮১২ সালের ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বেশ কিছু ঘরবাড়ি আর দালান-কোঠা। বাংলাপিডিয়া-র তথ্য অনুযায়ী, ১৭৭৫ সালের ভূমিকম্পটি অনুভূত হয়েছে ঢাকার আশেপাশের অঞ্চলে আর ১৮১২ সালের ভূমিকম্পটি হয়েছিল সিলেটে। তবে উভয় ভূমিকম্পেই হতাহতের কোনো বর্ণনা পাওয়া যায়নি।
১৮৬৫ সালের শীতকালে আরেকটি শক্তিশালী ভূমিকম্পের বর্ণনা পাওয়া যায় ১৯১২ সালের ‘ইস্টার্ন বেঙ্গল ডিস্ট্রিক্ট গ্যাজেটিয়ার চিটাগাং’এ। সীতাকুণ্ডের এক পাহাড় ফেটে বালি আর কাদা বেরোয় সেই সময়। তবে আর কোনো গুরুতর ক্ষতির তথ্য মেলেনি এই ভূমিকম্পে।
১৮৮৫ সালে মানিকগঞ্জে আঘাত হানা প্রায় ৭ মাত্রার ভূমিকম্পটি পরিচিত ‘বেঙ্গল আর্থকোয়েক’ নামে। এর সম্ভাব্য উপকেন্দ্র ছিল ঢাকার ১৭০ কিলোমিটার দূরবর্তী সাটুরিয়ার কোদালিয়ায়। এই ভূমিকম্পের তীব্রতা এত বেশি ছিল যে ভারতের বিহার, সিকিম, মণিপুর ও মিয়ানমারেও অনুভূত হয়েছিল কম্পন। ঢাকা, ময়নমনসিংহ, শেরপুর, পাবনা, সিরাজগঞ্জের অনেক দালানকোঠা, স্থাপত্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল সেবার। তবে এতে প্রাণহানীর কোনো সঠিক সংখ্যা জানা যায়নি।
১৮৯৭ সালের ১২ জুন সংঘটিত বিধ্বংসী ভূমিকম্পটি পরিচিত ‘দ্য গ্রেট ইন্ডিয়ান আর্থকোয়েক’ নামে। রিখটার স্কেলে যার মাত্রা ধারণা করা হয় প্রায় ৮। ১৯২৩ সালের ‘বেঙ্গল ডিস্ট্রিক্ট গ্যাজেটিয়ার পাবনা’য় বর্ণিত তথ্য অনুযায়ী, এই ভূমিকম্পে সিরাজগঞ্জে উপবিভাগীয় অফিসের উপরের তলা, কারাগার, ডাকঘরসহ নানা স্থাপনা ধ্বংস হয়। প্রায় সকল দালান স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয় ভীষণভাবে। অ্যান্ড্রু ইউল অ্যান্ড কোং এর পাটের ব্যাগের ফ্যাক্টরি ধূলিসাৎ হয়ে যায় এই ধাক্কায়। কোম্পানিটি তাদের ব্যবসাই গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয় এরপর। পাবনার কোর্ট হাউজসহ অন্যান্য ইটের স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভূপৃষ্ঠের নানা স্থানে চির ধরে, অনেক কূয়া পরিপূর্ণ হয় ভূ-তল থেকে উঠে আসা পলিমাটি আর বালিতে।
‘ইস্টার্ন বেঙ্গল ডিস্ট্রিক্ট গ্যাজেটিয়ার চিটাগাং’ থেকে জানা যায়, ১৮৯৭ সালের এই ভূমিকম্পটি পূর্বে দক্ষিণ লুসাই পর্বতমালা থেকে শুরু করে পশ্চিমে শাহাবাদ পর্যন্ত সমগ্র বাংলা জুড়ে অনুভূত হয়েছিল। যার সম্ভাব্য মূলকেন্দ্র ছিল আসামের চেরাপুঞ্জির কাছাকাছি। ভূমিকম্পের স্থায়ীত্বকাল ছিল জায়গাভেদে ছয় সেকেন্ড থেকে পাঁচ মিনিট পর্যন্ত। চট্টগ্রামে স্থায়ী ছিল সবচেয়ে বেশি সময় ধরে।
‘ইস্টার্ন বেঙ্গল ডিস্ট্রিক্ট গ্যাজেটিয়ার ঢাকা’র তথ্য মতে, উক্ত ভূমিকম্প ঢাকা শহরের অনেক উল্লেখযোগ্য স্থাপনার ক্ষতিসাধন করেছিল। সে তুলনায় প্রাণহানীর সংখ্যা ছিল বেশ কম। ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত সরকারি স্থাপনাগুলোর মেরামত বাবদ সেসময় খরচ হিসাব করা হয়েছিল প্রায় দেড় লাখ রূপি।
বাংলাপিডিয়া-র তথ্য অনুযায়ী, ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে শুধু সিলেট জেলাতেই মৃতের সংখ্যা ছিল ৫৪৫। ঢাকা-ময়মনসিংহ রেল ও সড়ক যোগাযোগ বিঘ্নিত হয় এর কারণে। রাজশাহীসহ পূর্বাঞ্চলের অন্যান্য জেলাও বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তখনকার হিসাবে শুধু অর্থ-সম্পত্তির ক্ষতিই হয়েছিল প্রায় ৫০ লাখ টাকা।
১৯১৮ সালে প্রায় ৭.৬ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হয় শ্রীমঙ্গলে। যা শ্রীমঙ্গল ভূমিকম্প নামেই পরিচিত। মিয়ানমার ও ভারতের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলেও অনুভূত হয়েছিল এই ভূমিকম্প। শ্রীমঙ্গলের অনেক দালান-কোঠা ধ্বংস হয়েছিল এই ভূকম্পনে।
১৯৫০ সালের ১৫ আগস্ট আঘাত হানে আসাম ভূমিকম্প। বিংশ শতকের অন্যতম ভয়ানক এই ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৮.৭। বাংলাদেশের নানান অঞ্চলে এটি অনুভূত হলেও তেমন কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি দেশে।
১৯৯৭ সালের ২২ নভেম্বর চট্টগ্রামে ৬ মাত্রার একটি ভূমিকম্প ঘটে। এতে শহরের নানান স্থাপনায় ফাটল ধরে।
বিংশ শতকে বাংলাদেশের শেষ উল্লেখযোগ্য ভূমিকম্পটি হয় মহেশখালী দ্বীপে। ১৯৯৯ সালের জুলাই মাসের সেই ভূমিকম্পটির কেন্দ্র ছিল এই দ্বীপেই। ৫.২ মাত্রার ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল দ্বীপের অনেক বাড়িঘর।
২ এপ্রিল ১৭৬২ খ্রিস্টাব্দে ভয়ানক শক্তিশালী এক ভূমিকম্প আঘাত হেনেছিল চট্টগ্রাম থেকে আরাকান পর্যন্ত অঞ্চলে। ৪ মিনিট স্থায়ী ভূমিকম্পের সময় কামান গর্জনের মতো ১৫টি বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গিয়েছিল। ৮ দশমিক ৮ মাত্রার ভূমিকম্পটির প্রভাবে সীতাকুণ্ড পাহাড়ে অগ্নি উদগিরণের ঘটনাও ঘটেছিল। কক্সবাজারের কাছে কয়েকশ মানুষকে নিয়ে একটি দ্বীপ সমুদ্রের গভীরে তলিয়ে গিয়েছিল। চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের অনেক পাহাড় ফেটে চৌচির হয় এবং পুকুর-দিঘি সমতল ভূমিতে পরিণত হয়। কর্ণফুলী নদীর পানিতে চট্টগ্রাম শহর ১০ ফুট উঁচু জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হয়েছিল। শহরের অনেক জায়গায় বিশাল গভীর ফাটল ও খাদের সৃষ্টি হয়েছিল।
পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় আরো ১১ বার ভূকম্পন অনুভূত হয়েছিল। চট্টগ্রাম শহরে মাটির ও ইটের তৈরি সব ঘরবাড়ি ভূপাতিত হয়েছিল। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রধান কুঠি ও দুর্গ সম্পূর্ণভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিল। কাঠের বাড়িতে বসবাস করার ফলে ইংরেজ কর্তাদের প্রাণ রক্ষা পেয়েছিল।
দেশীয় লোকদের হতাহতের কোনো সঠিক পরিসংখ্যান জানা না গেলেও নিহতের সংখ্যা কয়েকশ থেকে কয়েক হাজার হতে পারে। ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল চট্টগ্রামে হলেও এর প্রভাবে সমগ্র বাংলা কেঁপে উঠেছিল। এ ভূমিকম্পের প্রভাবে পরবর্তী সময়ে ব্রহ্মপুত্র নদসহ বেশ কয়েকটি নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছিল। এ ঘটনার চারটি নথি পাওয়া যায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পুরনো রেকর্ডে। সেখান থেকে আংশিক সংক্ষেপিত অংশ সংকলিত।
নথি-১: মি. এডওয়ার্ড গালস্টন (চট্টগ্রাম) থেকে মেজর জন কার্নাক (কলকাতা):
আপনাকে এ চিঠি লেখার মূল উদ্দেশ্য হলো একটি ভয়াবহ ভূমিকম্পের বিবরণ দেয়া। গত ২ এপ্রিল বিকাল ৫টায় এখানে যে কম্পন অনুভূত হয়েছিল, তা ৪ মিনিট ধরে স্থায়ী ছিল।
ভূমিকম্পের ধাক্কায় এখানকার ফ্যাক্টরি এবং ইটের তৈরি সব ভবন পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। সেগুলো আর বাস বা ব্যবহারের উপযোগী নেই। এর আশপাশে এবং অন্যান্য অনেক জায়গায় মাটি ফেটে গেছে এবং সেই ফাটল দিয়ে প্রচুর পরিমাণে জল উথলে উঠেছে। বিশেষ করে চেজ রোডের উত্তর দিকে দুই ফুট বা তারও বেশি চওড়া বিশাল ফাটল তৈরি হয়েছে। ঘটনাটি এতটাই অদ্ভুত ছিল যে সকালে ঘোড়ায় চড়ে যাওয়ার সময় ঘোড়াটি চমকে ওঠে এবং অন্য পথে ঘুরে যায়, কারণ সে ফাটলের ওপর দিয়ে যেতে রাজি হয়নি।
প্রথম কম্পনের সময় কামান দাগার মতো প্রচণ্ড ১৫টি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গিয়েছিল। মি. প্লেইস্টেড এবং অন্যরা সেই সংখ্যা গুনেছিলেন। ভূমিকম্পের সময় সকল পুকুর ও জলাধার উপচে পড়েছিল। নদীর জল সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো কূল ছাপিয়ে পঞ্চম বিস্ফোরণের সময় শহরের মধ্যে ছুটে এসেছিল।
সন্ধ্যা ৬টা থেকে ৭টার মধ্যে আমি দ্বাদশ কম্পনটি অনুভব করি। এছাড়া মাউন্ট প্লেজ্যান্ট থেকে দূরে ম্যারিয়েট’স হিলের ওপর এমন ঝাঁকুনি অনুভূত হয়েছিল, যা সবার কাছে মনে হচ্ছিল যেন অবিরাম গতিতে চলছে।
আমার জীবনে এমন অসাধারণ ও ভয়াবহ ঘটনা আর একটিও দেখিনি। আপনি হয়তো সংযুক্ত কাগজে অনেকগুলো ভূকম্পনের তালিকা দেখতে পাবেন। কিন্তু আসল শক্তিটি ছিল প্রথম কম্পনটিতে; সেটির মাধ্যমেই ভূমিকম্পের পুরো ক্ষমতা প্রকাশ পেয়েছিল।
গত দুদিন ধরে মাটির বারবার কম্পনের কারণে প্রত্যেকেই মাথা ঘোরা ও আতঙ্কে ছিল। তাদের ধারণা হয়েছিল পুরো পৃথিবী বুঝি অনবরত কাঁপছে। যদিও মেঝেতে রাখা এক গ্লাস জল রেখে পরীক্ষা করার পর সেই ধারণাটির সমর্থন পাইনি (কারণ ভূমিকম্প থামার পর জল স্থির ছিল)।
আমার জীবনের সবকিছুর বিনিময়েও আমি চাই না যে প্রথমটির মতো এমন একটি ভয়াবহ কম্পন কলকাতায় ঘটুক। কারণ সেখানে ছাদযুক্ত যত দালানকোঠা আছে, সেগুলো নিশ্চিতভাবে ধ্বংস হয়ে যাবে। তাই আমি নিজেকে এই ভেবে সান্ত্বনা দিচ্ছি যে সবচেয়ে খারাপটি আমাদের এখানে ঘটে গেছে।
নথি- ২: গভর্নর হ্যারি ভেরেলস্ট (চট্টগ্রাম) থেকে গভর্নর জেনারেল মি. হেনরি ভ্যানসিটার্ট (কলকাতা):
আবহাওয়াটা বেশ কিছুদিন ধরে গুমোট আর উষ্ণ ছিল। এপ্রিলের ২ তারিখ বিকাল ৫টার দিকে হঠাৎ করে একটা কম্পন, প্রথমে মৃদু তারপর বাড়তে বাড়তে এমন ভয়ানক ঝাঁকুনি শুরু করল। পরবর্তী ২ মিনিট ধরে চারপাশের সব গাছপালা, পাহাড়, বাড়িঘর থরথর করে কাঁপছিল, এত জোরে কাঁপছিল যে পায়ের তাল রাখা যাচ্ছে না। কয়েকজন কৃষ্ণকায় স্থানীয় লোক ধপাস করে মাটিতে পড়ে গেল এবং প্রচণ্ড ভীতিতে আক্রান্ত হয়ে তাদের কয়েকজন ওখানেই মারা গেল, বাকিরা এমনভাবে আক্রান্ত হয়েছে যে এখনো তারা স্বাভাবিক হতে পারেনি। নদী, সমুদ্র ও উপকূলবর্তী সমতলে সবচেয়ে বেশি আঘাত করেছে এ ভূমিকম্প।
আমাদের কপাল ভালো যে আমরা কাঠের বাংলোতে ছিলাম, যদি ইটের বাড়িতে থাকতাম তাহলে এতক্ষণে সেটা মাটিতে মিশে যেত। দুর্গের মধ্যে আমাদের নতুন যে ঘরটি সর্বোত্তম ইট-সুরকি দিয়ে খুব মজবুত করে বানানো হয়েছে সেটি ভেঙে পড়েছে। পুরনোটি তো ভেঙে চুরচুর হয়ে মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। শহরের বিভিন্ন স্থানে মাটিতে বিশাল ফাটল সৃষ্টি হয়ে ভূগর্ভ থেকে সালফারের গন্ধযুক্ত পানি উদ্গার করেছে। অনেক জলপূর্ণ পরিখা ও পুকুর শুকনো সমতল ভূমিতে পরিণত হয়েছে।
আমরা এত বেশি ভয়-বিহ্বলতায় আক্রান্ত হয়েছিলাম যে ভূমিকম্পের আক্রমণের দিকনিশানা পর্যন্ত ঠিকমতো বুঝতে পারিনি। কখনো মনে হয়েছে পূর্ব থেকে পশ্চিম, কখনো পশ্চিম থেকে পূর্বে ধাক্কা দিচ্ছে। কিছু জায়গায় পুকুরের পানি উত্তর থেকে দক্ষিণে ঢলে বেরিয়ে গেছে। দেয়াঙ পরগনার অনেক জায়গায় ১০-১২ হাত প্রশস্ত ফাটল দেখা দিয়েছে ভূমিতে। কিছু কিছু ফাটল এত গভীর যে তা মাপার সাধ্য ছিল না। ভূমিকম্পের পরপরই শহরজুড়ে জলোচ্ছ্বাসের মতো পানি এসে ঢুকল। প্রায় সাত হাত পানির নিচে ডুবে গেল শহর। নদীর উল্টোদিকের একটা গ্রামও সাত হাত পানির নিচে তলিয়ে গেছে।
পাথরঘাটা থেকে হাওলার আট মাইল দূরত্বের মধ্যে ভূমিতে বিশাল সব ফাটল তৈরি হয়ে জলে নিমজ্জিত হয়ে গেছে। বাঁশবাড়িয়ার কাছে সমুদ্র উপকূলের সাত জায়গায় মাটি ফেটে কুয়োর মতো গর্ত হয়ে গেছে। ১০ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে নিমজ্জিত হয়েছে। ওখানে বড় একটা ইটের তৈরি কাছারি ঘর ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। হালদার কাছে সঞ্চারম কানুনগোর বাড়ির কাছে বারো দ্রোন জমি ডুবে গেছে পানিতে। দোহাজারীতে হরি সিং হাজারীর পাকা বাড়ি মাটিতে মিশে গেছে। শেখ জামালখানের ইটের বাড়িও ধসে পড়েছে, তিনি নিজেও তাতে গুরুতর আহত হয়েছেন। বাড়ির কাছে দুইশ হাত চওড়া গভীর এক ফাটল তৈরি হয়ে সঙ্গে সঙ্গে তা এতটা জলস্রোতে পরিপূর্ণ হয়েছে যে গভীরতা মাপাও অসম্ভব এখন। হাওলা পরগনার শ্যাম রায়ের বাড়ি ভেঙে তার উঠোন দুদিন দুই হাত পানির নিচে ডুবে ছিল।
বরুমছড়ার জমিজমা দুই হাত পানির নিচে তলিয়ে গেছে। সঞ্চারম কানুনগোর ইটের দেউড়ি ভেঙে পড়লে তার এক আত্মীয় মারা যায়। কালুরঘাটের কাছে করলডেঙ্গা পাহাড়ও দুই ভাগ হয়ে তার বিশাল একটা অংশ নদীতে পড়ে গেছে। বাজালিয়া খাল ও দোহাজারী খালের স্রোত থমকে গেছে। সেখানে তিন দ্রোনের মতো জমি পানিতে ডুবে গেছে। আলী চৌধুরীর উঠোনেও বিশাল ফাটল তৈরি হয়ে জলে পূর্ণ হয়ে গেছে চারপাশ। সোয়াবিল থেকে মুরাদাবাদ পর্যন্ত তিনজন তালুকদারের সব জমি ডুবে গেছে, সেখানে চারজন মারা গেছে।
সবচেয়ে অদ্ভুত কাণ্ড ঘটেছে বাহারছড়ায়। কক্সবাজারের কাছে বাহারছড়ায় সমুদ্রের কাছে পাঁচ-ছয় ক্রোশের মতো জায়গার একটা গ্রাম কয়েকশ মানুষ, গবাদিপশু নিয়ে পানির নিচে চলে গেছে। জায়গাটি সমুদ্রের অংশ হয়ে গেছে। তাদের আর কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। শিলকোপায় ভূমিতে ফাটল তৈরি হয়ে বিপুল পরিমাণ লবণাক্ত পানি ছিটকে বেরিয়েছে। দুই পাহাড়ের মাঝের উপত্যকায় কিছু ছড়া ও খালের স্রোত বন্ধ হয়ে বালিতে পূর্ণ হয়ে গেছে। আবার কোনো কোনো খালের গভীরতা বেড়ে ২০ হাতও হয়ে গেছে।
শিকলবাহা আর ইছামতী নদীর স্রোত থেমে গেছে। সেখানে কিছু পণ্যবাহী নৌকা আটকে পড়েছে। ওখানেও কিছু ভূমিতে অসংখ্য ফাটল, কিছু ভূমি পানিতে নিমজ্জিত, কিছু পুকুর বালিতে পূর্ণ হয়ে গেছে। বরকল পাহাড়ে ৪০ ফুট প্রশস্ত ফাটল দেখা গেছে। কাসালং পাহাড়ের একাংশ সম্পূর্ণ ডুবে গেছে নদীতে।
চাঙ্গি পাহাড়ে ২০-৩০ হাত প্রশস্ত ফাটল দেখা গেছে। পদুয়া খাল পানিশূন্য হয়ে দুটো বালির পর্বত নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এখানকার বাড়িঘরগুলো ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। জুমপেদিয়া পাহাড়টি ভূমিতে এত ডেবে গেছে যে তার চূড়াটি এখন সমতল ভূমির সঙ্গে মিশে যাওয়ার উপক্রম। রিগেরি পাহাড়ে ২০ ফুট প্রশস্ত ফাটল। জুমপালং পাহাড়ে ২৫ ফুটের ফাটল।
এ পর্যন্ত প্রাপ্ত খবরে ১২০ দ্রোনের মতো জমি ভূগর্ভে হারিয়ে গেছে। কিন্তু এখনো সম্পূর্ণ ধ্বংসযজ্ঞের খবর আসছে। প্রতিদিনই নতুন নতুন খবর আসছে। আমার মনে হয় এ পর্যন্ত যা খবর এসেছে তা সত্যিকারের ধ্বংসযজ্ঞের এক-অষ্টমাংশ মাত্র।
নথি-৩: মি. এডওয়ার্ড গালস্টন (চট্টগ্রাম) থেকে মি. হার্স্ট (কলকাতা):
এ ভূমিকম্পে দেয়াঙ পরগনার বারিয়া গ্রামে মোহাম্মাদ আসাদ চৌধুরীর জমি প্রায় ১০-১২ হাত ফাঁক হয়ে গেছে। দেখে মনে হচ্ছে যেন এটি একটি গভীর খাদ বা খাল। এ ফাটল দিয়ে জল ওপরে উঠে আসায় সেখানে বসবাসকারী কৃষকদের জমি আট হাত জলের নিচে তলিয়ে গেছে। মোহাম্মাদ আফজার চৌধুরীর বাড়ির চলাচলের পথটিও ১০-১২ হাত গভীর খাদে পরিণত হয়েছে।
গয়াপাড়ার মোক্তারাম ফৌতাদার জানিয়েছেন যে তার বাড়ির উত্তর ও পূর্ব দিক ফেটে গেছে। সেই ফাটল দিয়ে ফোয়ারার মতো জল ওপরে উঠে এসেছে এবং সেখানকার জমি প্রতিদিন একটু একটু করে নিচে ডেবে যাচ্ছে।
বাঁশবাড়িয়ায় লবণ কারখানার দারোগা সাতু মাস্টারের চিঠি থেকে জানা যায় যে আকলপুরার পশ্চিম দিকে লবণ কারখানার একটি দ্বীপ তার পূর্ব দিকের সমুদ্রের সঙ্গে মিশে গেছে। তার উত্তর ও দক্ষিণ দিকে ৫-৭ হাত চওড়া এবং ১০ হাত গভীর ফাটল সৃষ্টি হয়েছে। সেই ফাটল থেকেও ফোয়ারার মতো জল ওপরে উঠে আসছে। মাটি নিচে দেবে যাওয়ায় ওটার কোনো চিহ্ন সেখানে অবশিষ্ট নেই। ওটার ভবিষ্যৎ কী হবে তা আমরা জানি না। সেখানকার অধিবাসীদের কাছ থেকে আমরা জানতে পেরেছি যে এ স্থানগুলো এর আগে কখনই এতটা গভীর জলের নিচে তলিয়ে যায়নি।
আসলে এ দুর্যোগে মোট ক্ষতির সম্পূর্ণ তথ্য এখনো এসে পৌঁছেনি, তাই এ মুহূর্তে সঠিকভাবে কিছু বলতে পারছি না। তবে সরকারের যেসব লবণ গুদামে মজুদ ছিল, তার সবই জলের নিচে চলে গেছে। এছাড়া আপনার এ অধম কর্মচারীর মাটির তৈরি বাড়িটি ভূমিকম্পে এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে তা এখন কোনোমতে দাঁড়িয়ে আছে। হালদা এলাকার সাচিরাম কানুনগোর ১২ দ্রোন জমি সম্পূর্ণভাবে জলের নিচে তলিয়ে গেছে। একইভাবে তাকালিয়ার ব্রজলাল চৌধুরীর প্রায় পাঁচ দ্রোন জমিও ডেবে গিয়ে জলের নিচে নিমজ্জিত হয়েছে।
দোহাজারীর হরি সিংহের বাড়ি এবং শের জামান খাঁর একটি ইটের তৈরি দালান ভেঙে পড়েছে। খাঁ সাহেব নিজেও দালানচাপা পড়ে আহত হয়েছেন। তার বাড়ির সামনে ২০০ হাত দীর্ঘ একটি বিশাল গর্ত বা খাদ তৈরি হয়ে জলে ভরে গেছে। হাওলা অঞ্চলের খাজনা আদায়কারী শ্যামরামের বাড়িটি ভেঙে গুঁড়িয়ে গেছে। তার বাড়ির চারপাশের বেড়া পর্যন্ত উপড়ে গেছে। তার বাড়ি এবং সংলগ্ন মাছের পুকুরগুলো বালিতে ভরে গেছে এবং এখনো পুরো এলাকা দুই হাত জলের নিচে ডুবে আছে।
ধর্মপুরে শান্তিরাম কানুনগোর গ্রামের বাড়িটি পুরোপুরি ধসে পড়েছে। ইসলামাবাদের কোতোয়াল তার নিজের মুখে জানিয়েছেন যে বরুমছড়া নামক একটি স্থান কোমরসমান জলে প্লাবিত হয়েছে। মানুষ নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে ভয়ে ওই এলাকা ছেড়ে পালাতে বাধ্য হওয়ায় সেখানে কোনো জীবন্ত প্রাণী অবশিষ্ট নেই; শুধু খোঁয়াড়ে আটকে থাকা গবাদিপশুরা রয়ে গেছে। ইসলামাবাদের দলিল লেখক শান্তিরাম কানুনগোর শহরের ইটের তৈরি দালানটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। তার ভাইদের একজন—রাজারাম—ইটের আঘাতে মারা গেছেন। অন্য ভাই নন্দরামের বাড়িও একই রকমভাবে ভেঙে পড়েছে, যার ফলে তার এক ছেলে মাথায় আঘাত পায়।
কর্ণফুলী নদীর খুব কাছে কদর কাছিয়া নামক একটি উঁচু পাহাড়ের পূর্বদিকের কোদালিয়া নামের একটি পাহাড় এমনভাবে ফেটে গেছে যে নদীর ওই অংশ দিয়ে নৌকা চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে।
বাজালিয়া, সাঙ্গু ও দোহাজারীর খালগুলো থেকে বালির বাঁধ ওপরে উঠে এসেছে, ফলে ওই খালগুলো পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে পড়েছে। গান্ধারাজোয়ারে মোহাম্মাদ আলী চৌধুরীর প্রায় ৩ দ্রোন জমি ডেবে যায় (যেন কেউ তা গ্রাস করে নিয়েছে)। তার বাড়িতে যাওয়ার প্রবেশপথ বন্ধ হয়ে গেছে এবং ভূগর্ভ থেকে জল ওপরে উঠে বাড়িটির চারপাশ প্লাবিত করেছে।
এছাড়া ইসলামাবাদ দুর্গের একটি মজবুত ইমারত ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত ফেটে গিয়ে ভেঙে পড়েছে। এমনকি নতুন তৈরি করা একটি দালানও ফেটে গেছে। বিল্লাহ খাঁর একটি বড় পুকুর গভীর খাদে পরিণত হয়েছে। ইসলামাবাদ শহরের অঘইগঞ্জের পূর্ব দিকে মাটি ফেটে গিয়ে অনেক ঝরনা থেকে জল ওপরে উঠছিল। চেপাইতলীতে শাহ সাগীর চৌধুরীর প্রায় ১২ কানি জমি জলে ডুবে গেছে এবং চাষের অযোগ্য হয়ে পড়েছে।
চেতনারায়ণ সার্ভেয়ারের চিঠি থেকে আমরা জানতে পারি যে হালদা নদীর পাশেই অবস্থিত সোয়াবিল চাকলার উত্তর দিক ভেঙে জলের নিচে তলিয়ে গেছে। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে আরো চারজন মানুষ চাপা পড়ে মারা গেছে।
ইসলামাবাদে মি. গ্রিফিথের ইটের তৈরি বাড়ি ফেটে গেছে, সেই সঙ্গে এখানে থাকা একজন পর্তুগিজ—জুয়ান ডি বারিস—এর বাড়ি ও দেয়ালও ফেটে গেছে। এছাড়া নাহারছড়া থেকে খবর এসেছে যে সেই দ্বীপের বেশির ভাগ জমিই ফেটে গিয়ে জলের নিচে তলিয়ে গেছে এবং বেশ কিছু মানুষ সেখানে মারা গেছে। এর বাইরে সেই দ্বীপের কী পরিণতি হয়েছিল সে ব্যাপারে আপনি বাংলা থেকে পাঠানো আলাদা বিবরণ থেকে জানতে পারবেন।
ইসলামাবাদ থেকে প্রায় চারদিনের দূরত্বে জুম চাষের এলাকার অবস্থা সম্পর্কে আমরা যেসব তথ্য পেয়েছি, তা থেকে জানতে পেরেছি রেয়াং পাহাড় মাঝখান বরাবর ফেটে গিয়ে ৪০ হাত নিচে ডেবে গেছে। সেই সঙ্গে কাসালং পাহাড়টি মাটির সঙ্গে সমান হয়ে মিশে গেছে। বাংগু চাঙ্গি নামক একটি জুম পাহাড়ও মাঝখান বরাবর ফেটে গিয়ে ৩০ হাত নিচে ডেবে গেছে। সেখানকার অধিবাসীদের বেশির ভাগের ঘরবাড়ি ভেঙে পড়েছে।
চাতার পাট্টুয়া নামক একটি জুম পাহাড়ও অল্প অল্প করে ফেটে জমির সমতলে নেমে এসেছে। পাহাড় ফেটে যাওয়ায় সেখানকার গাছপালা ধ্বংস হয়েছে, যার ফলে জুম চাষের রাস্তা বন্ধ হয়ে গেছে। বাজালিয়াতে অন্য একটি জুম পাহাড় নদী পর্যন্ত ফেটে গেছে। সেখানে ৩০ হাত চওড়া ফাটল সৃষ্টি হয়েছে এবং সেই ফাটল দিয়ে জল ওপরে উঠে এসেছে। পালাং নামক একটি জুম পাহাড় ফেটে গিয়ে ২৫ হাত ডেবে গেছে।
এসব অঞ্চলের মধ্যে ঘটে যাওয়া এবং এখনো চলমান এ ভয়ানক বিশৃঙ্খলা সম্পর্কে আপনাকে অবহিত করার উদ্দেশ্যেই এ বিবরণটি তৈরি করা হয়েছে। আমরা জানতে পেরেছি সৃষ্টির শুরু থেকে (আদমের সময় থেকে) এখন পর্যন্ত এ অঞ্চলে এমন ঘটনা কেউ কখনো শোনেনি। যদি আমি এক হাজার উদাহরণ দিয়েও ওইসব ঘটনার বিবরণ লিখি, তবু তাতে যতটা লিখতে পারব, তা আসল ঘটনার দশ ভাগের এক ভাগও হবে না।
নথি-৪: মি. রেভারেন্ড হার্স্ট (কলকাতা) থেকে লন্ডনের রয়্যাল সোসাইটির সম্পাদক মি. বার্চ (আংশিক বিবরণ)
এ ভূমিকম্প গত ২ এপ্রিল ঘটেছিল এবং এটি বাংলা, আরাকান ও পেগু রাজ্যে মারাত্মকভাবে আঘাত হানে। বিশেষ করে আরাকানের রাজধানী শহরে এর প্রভাব ছিল সবচেয়ে বেশি। সেখানে বসবাসকারী একজন ইংরেজ ব্যবসায়ীর মতে, এ ভূমিকম্প ১৭৫৫ সালের লিসবন ভূমিকম্পের মতোই ভয়াবহ ছিল।
ঢাকায়ও এ ভূমিকম্প ছিল খুব সাংঘাতিক। নদীতে জলের উত্থান এত ভয়ংকর ও হিংস্র ছিল যে শত শত দেশীয় নৌকা তীরে বা চড়ায় ধাক্কা খেয়ে ভেঙে যায় অথবা ভেসে হারিয়ে যায় এবং বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটে।
চট্টগ্রাম থেকে পাওয়া ক্ষয়ক্ষতির বিবরণগুলো যে কী পরিমাণ ভয়াবহ ছিল, তার প্রমাণস্বরূপ আমি তিনটি বিবরণী সংযুক্ত করছি। একটি লিখেছেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেবায় নিয়োজিত এক তরুণ ভদ্রলোক মি. এডওয়ার্ড গালস্টন। অন্য দুটি ফার্সি মূল নথি থেকে অনুবাদ করা।
এ ভূমিকম্প ঘিরোটি নামক স্থানেও মারাত্মক প্রভাব ফেলেছিল। সেখানকার নদী ও পুকুরের জল ভীষণভাবে আলোড়িত হয়েছিল এবং বহু জায়গায় জল ছয় ফুটেরও বেশি উচ্চতায় উঠেছিল। চন্দননগর থেকে ফেরার পথে আমি নিজের চোখে দেখে তা নিশ্চিত হয়েছি। প্রায় একই সময়ে এ ভূমিকম্প কলকাতায়ও অনুভূত হয়েছিল। আমি খবর পেয়েছি যে সেখানেও জলের আলোড়ন ছয় ফুট উচ্চতা লাভ করেছিল।
হারুন রশীদ: প্রাচীন সভ্যতা ও ইতিহাস অনুসন্ধানী লেখক

Posted ১:২২ অপরাহ্ণ | শনিবার, ০৬ ডিসেম্বর ২০২৫
coxbangla.com | Chanchal Das Gupta